ইলামবাজারের হাটতলা গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দির
পোড়ামাটির শিল্প ও ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ইলামবাজারের ব্যস্ত বাজারের এক কোণে অবস্থিত ঊনবিংশ শতাব্দীর হাটতলা গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দির, যা শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দির নামেও পরিচিত। বাংলার পোড়ামাটির মন্দির স্থাপত্যের অন্যতম ব্যতিক্রমী নিদর্শন এই মন্দির। অষ্টভুজাকৃতির পরিকল্পনায় নির্মিত মন্দিরটির গায়ে রয়েছে অসাধারণ কারুকার্য ও সূক্ষ্ম পোড়ামাটির ফলক। স্থাপত্য গবেষক ডেভিড ম্যাককাচিয়ন ১৯৬০-এর দশকে মন্দিরটির বিবরণ নথিভুক্ত করেন। সেই সময় তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, এই মন্দিরটির মাথায় কোনও ছাদ ছিল না। বর্তমানে মন্দিরটিকে রক্ষা করার জন্য টিনের পাত দিয়ে একটি ছাউনি তৈরি করা হয়েছে। যদিও এই ছাউনি বৃষ্টির হাত থেকে মন্দিরকে কিছুটা রক্ষা করে, তবুও এর নিচে থাকা অপূর্ব পোড়ামাটির শিল্পকর্মের সঙ্গে টিনের ছাউনির সামঞ্জস্য যেন কিছুটা বেমানান।
মন্দির দর্শনের অভিজ্ঞতা
টিনের ছাউনির দিকে নজর না দিয়ে মন্দিরের উপরের অংশ থেকে পর্যবেক্ষণ শুরু করলে প্রথমেই চোখে পড়ে নকল প্রবেশদ্বারগুলির উপরে স্থাপিত অসাধারণ পোড়ামাটির ফলকগুলি। এই ফলকগুলির অধিকাংশই এখনও বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে এবং বাংলার প্রাচীন শিল্পীদের দক্ষতার পরিচয় বহন করে।

কৃষ্ণলীলা
একটি ফলকে চিত্রিত হয়েছে কৃষ্ণলীলার একটি বিশেষ ঘটনা। পুরাণকথা অনুসারে, ব্রহ্মা বাছুর ও গোপবালকদের একটি বনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ নিজেই সেই হারিয়ে যাওয়া বাছুর ও বালকদের রূপ ধারণ করে এক বছর ধরে তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হন। ফলকটিতে ব্রহ্মাকে চারমুখী রূপে দেখানো হয়েছে, যদিও বর্তমানে তিনটি মুখই দৃশ্যমান। এই পোড়ামাটির ফলকটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।

রাম ও রাবণের যুদ্ধ
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শ্রীরামচন্দ্র ও রাবণের মধ্যকার যুদ্ধের দৃশ্য। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্যে নির্মিত এই ফলকে যুদ্ধের মূল দৃশ্যের পাশাপাশি দুই পাশের অলংকরণেও শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
দেবী দুর্গা বা মহিষাসুরমর্দিনী
পরবর্তী ফলকে দেখা যায় সিংহের উপর উপবিষ্ট দেবী দুর্গাকে, যাঁকে সম্ভবত মহিষাসুরমর্দিনী রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। দেবীর ডানদিকে রয়েছেন গণেশ ও লক্ষ্মী, আর বাঁদিকে সরস্বতী ও কার্তিকেয়। তবে সরস্বতী ও কার্তিকেয়ের মূর্তিগুলি বর্তমানে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত। দেবী দুর্গার পিছনে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চালচিত্র, যেখানে ঢেউয়ের মতো অলংকরণের মাধ্যমে দেবীর ঐশ্বরিক জ্যোতি প্রকাশ করা হয়েছে।

ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন
অন্য একটি ফলকে দেখা যায় রাজা ভগীরথের তপস্যা ও প্রচেষ্টায় গঙ্গার মর্ত্যে আগমনের কাহিনি। এই দৃশ্যের চারপাশে রয়েছে একাধিক বিশিষ্ট হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি। মন্দিরের অবস্থানের কারণে ফলকটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা কিছুটা কঠিন।

রাসচক্র
মন্দিরের আরেকটি বৃহৎ ফলকের বিষয়বস্তু নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে সেখানে রোমান স্থাপত্যরীতির অনুপ্রেরণায় নির্মিত, খাঁজবিহীন করিন্থীয় স্তম্ভের মতো নকশা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এ ছাড়া মন্দিরে একটি রাসচক্রের ফলক রয়েছে, যা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর পাশের কয়েকটি অলংকৃত ফলকের পরিবর্তে সাধারণ টালি বসানো হয়েছে।
মৃত্যুলতা: মানুষ ও প্রাণীর ধারাবাহিক ভাস্কর্য
মন্দিরের বাইরের কোণগুলিতে, যেখানে দুটি দেওয়াল পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেখানে রয়েছে লম্বালম্বি পোড়ামাটির অলংকরণ। এগুলিকে বলা হয় ‘মৃত্যুলতা’ বা Mrittulata। এই ধরনের ফলকে মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি একটির উপরে আরেকটি সাজানো থাকে। প্রতিটি প্রাণী বা মানুষের অবয়ব যেন তার নিচের অবয়বটিকে আক্রমণ করতে উদ্যত। এই ধারাবাহিক নকশা মন্দিরের দেওয়ালের দৈর্ঘ্য বরাবর পুনরাবৃত্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এই অলংকরণরীতির উৎস বাংলার প্রাচীন কাঠের রথ নির্মাণশৈলীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। রথের মূল কাঠামোর বাইরের কোণগুলিতে মানুষের ও প্রাণীর অবয়ব দিয়ে তৈরি লম্বালম্বি ফলক বসানো হতো, যেগুলিকে ‘বর্ষা’ ফলক বলা হয়। বাংলায় রথ ও মন্দির নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা একই সূত্রধর বা কাঠের কারিগর সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রথের এই নকশা পরবর্তীকালে মন্দিরের স্থাপত্যেও স্থান পায় বলে মনে করা হয়।
হাটতলা গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দিরে মৃত্যুলতার একাধিক ধরন দেখা যায়। কয়েকটি ফলক বেশ ক্ষয়প্রাপ্ত, যা সম্ভবত প্রাচীন নির্মাণের অংশ। অন্য কয়েকটি তুলনামূলকভাবে নতুন ও ভালো অবস্থায় রয়েছে, যেগুলি পরবর্তী সংস্কারের সময় তৈরি বা প্রতিস্থাপিত হয়ে থাকতে পারে।
এখানে দেখা একটি জটিল ধারাবাহিক নকশায় রয়েছে বাঘ, কুকুর, মানুষ, ঘোড়া, সিংহ, পুনরায় মানুষ এবং শেষে হাতির অবয়ব। এই ধরনের গতিশীল ও পরস্পর-সংযুক্ত ভাস্কর্য বাংলার পোড়ামাটির শিল্পে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে।

নকল প্রবেশদ্বার ও মন্দিরের বর্তমান অবস্থা
অলংকৃত ফলকগুলির ঠিক নিচে রয়েছে নকল প্রবেশদ্বার বা অলংকারমূলক দরজা। এগুলিও মন্দিরের শিল্পসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে দুঃখজনকভাবে, দরজাগুলির মূল কাঠামোতে পরবর্তীকালে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। কয়েকটি দরজার মধ্যে জানালার মতো ছিদ্র তৈরি করা হয়েছে, যা বেশ অমার্জিতভাবে কাটা হয়েছে বলে মনে হয়। সম্ভবত গর্ভগৃহের ভিতরে আলো প্রবেশ করানোর জন্য এই পরিবর্তন করা হয়েছিল।
বর্তমানে মন্দিরটি একটি জীবন্ত উপাসনাস্থল, যেখানে গৌর-নিতাই বিগ্রহের পূজা হয়। তবে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মূল রূপ অক্ষুণ্ণ রেখে এই ধরনের পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মন্দিরটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল এর নীচের অংশের শোচনীয় অবস্থা। উপরের দিকে পোড়ামাটির ফলকগুলি এখনও অনেকাংশে অক্ষত থাকলেও নীচের অংশে বহু ফলক সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়েছে অথবা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে তাদের মূল নকশা আর চেনা যায় না। ফলে ভিতরের ইট ও মাটির গাঁথনি উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, যা নিজেও ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে।
ইলামবাজারের সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক অতীতের স্মৃতি
মন্দিরের যেসব পোড়ামাটির ফলক এখনও টিকে রয়েছে, তার মধ্যে অস্ত্রধারী সৈন্য এবং পালতোলা জাহাজের চিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ভাস্কর্যগুলি ইলামবাজারের একসময়ের সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়।
একসময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের সংযোগস্থল এবং নদীপথের সুবিধার কারণে ইলামবাজার একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। ১৭৮০-এর দশকে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলে আসে। তাদের বাণিজ্যিক কার্যকলাপের ফলে আশপাশের তাঁত ও বয়নশিল্পকেন্দ্রগুলির পণ্যের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরও এখানে একটি বাণিজ্যকুঠি ছিল। ১৭৮৬ সালে তারা বীরভূম জেলার প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইলামবাজারের জন এরস্কিন ছিলেন এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। তাঁর একাধিক নীলকুঠিও ছিল। এই বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির স্মৃতি মন্দিরের পোড়ামাটির ফলকে খোদাই করা পালতোলা জাহাজ ও ইংরেজ সৈন্যদের চিত্রে যেন আজও জীবন্ত হয়ে রয়েছে।
কিছু ফলকে নৌকার সামনে অস্বাভাবিক অনুপাতে নির্মিত একটি বাড়ির চিত্রও দেখা যায়। অন্য একটি পালতোলা জাহাজের ফলক উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। এই দৃশ্যগুলি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় স্থাপত্যের অলংকরণেও শিল্পীরা তাঁদের সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছিলেন।
মন্দির সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ
মন্দিরটি ঠিক কবে রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আসে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে মন্দিরের প্রবেশপথে স্থাপিত একটি মার্বেল ফলকে উল্লেখ রয়েছে যে, খয়েরবুনি গ্রামের বাসিন্দা অনিলা বালা ঘড়াইয়ের স্মৃতিতে প্রায় পনেরো বছর আগে মন্দিরের মেঝে সংস্কার করা হয়েছিল। এই ফলকটি মন্দিরের সাম্প্রতিক সংস্কার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
হাটতলা গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দির তাই একদিকে যেমন বাংলার পোড়ামাটির শিল্পের অসাধারণ নিদর্শন, অন্যদিকে তেমনই অবহেলা ও সময়ের ক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলা এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য। এর দেওয়ালে খোদাই করা পুরাণকথা, মৃত্যুলতার জটিল নকশা এবং পালতোলা জাহাজের দৃশ্য আজও অতীতের শিল্প, বিশ্বাস ও বাণিজ্যের এক অনন্য কাহিনি তুলে ধরে। যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।