পিয়াসাড়া সরকার বাড়ি: ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বনেদিয়ানা

হাওড়া থেকে বেশি দূরে নয়, তারকেশ্বর রেলপথের লোকনাথ স্টেশনের কাছেই রয়েছে এক শান্ত, সবুজ গ্রাম—পিয়াসাড়া। গ্রামের পথ ধরে এগোলে আজও চোখে পড়ে বাংলার অতীতের এক হারিয়ে যেতে বসা অধ্যায়—পিয়াসাড়া সরকার বাড়ি।

প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই জমিদারবাড়ি। একসময় এখানে ছিল জমজমাট জীবনযাত্রা, রাজকীয় স্থাপত্য আর দুর্গাপুজোর বিরাট আয়োজন। আজ সেই জৌলুস অনেকটাই ম্লান, কিন্তু ইতিহাসের গল্পগুলো এখনও রয়ে গেছে এই বাড়ির আনাচে-কানাচে।

পিয়াসাড়া নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ বলেন, একসময় এই অঞ্চলে শাল আর পিয়াল গাছের ঘন বন ছিল। সেই বন কেটে বসতি গড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামের নামের ইতিহাস। আবার এই নামের সঙ্গে প্রাচীন সংস্কৃতির যোগ খোঁজেন কেউ কেউ।

কথিত আছে, আঠারো শতকের প্রথম ভাগে এই পরিবারের পূর্বপুরুষদের হাত ধরেই জমিদারবাড়ির উত্থান শুরু হয়। তখন পরিবারের পদবি ছিল ‘খাঁ’। একসময় রাজকর দিতে না পারায় শরৎচন্দ্র খাঁ-কে বর্ধমানের মহারাজার দরবারে হাজির হতে হয়। সেখানে তিনি নিজের আর্থিক অসুবিধার কথা জানান এবং বলেন, অর্থের অভাবে তাঁর বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

মহারাজা তাঁকে শর্ত দিলেন—অল্প সময়ের মধ্যে যদি তিনি দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে পারেন, তবে তাঁকে ক্ষমা করা হবে। গ্রামে ফিরে শরৎচন্দ্র খাঁ সমস্ত বাধা অতিক্রম করে পুজোর ব্যবস্থা করেন। সেই আয়োজন দেখে সন্তুষ্ট হয়ে বর্ধমানের মহারাজা তাঁকে ‘সরকার’ উপাধি দেন এবং নিষ্কর সম্পত্তি দান করেন বলে পারিবারিক কাহিনিতে প্রচলিত রয়েছে। সেই থেকেই পিয়াসাড়া সরকার বাড়ির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।

এই বাড়ির স্থাপত্যেও রয়েছে অতীতের রাজকীয় ছাপ। সময়ের সঙ্গে বাড়িটি নতুন বাড়ি ও পুরাতন বাড়ি—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়। কাছারিবাড়ির সামনে রয়েছে বিশাল ‘হাতিগলা গেট’। কথিত আছে, হাতির পিঠে চেপে আসা রাজকর্মচারী ও অতিথিদের প্রবেশের সুবিধার জন্যই এই উঁচু গেট তৈরি করা হয়েছিল। একসময় অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য ছিল রসবাড়িও।

তবে পিয়াসাড়া সরকার বাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তাদের দুর্গাপুজো। বাংলার অধিকাংশ বনেদি বাড়িতে যেখানে দশভুজা দুর্গার আরাধনা হয়, সেখানে এই বাড়িতে দেবী পূজিত হন বিরল চতুর্ভুজা, অর্থাৎ চার হাতবিশিষ্ট রূপে। এই ব্যতিক্রমী প্রতিমাই পুজোটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।

পুজোকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প ও স্মৃতি। অতীতে পশুবলির প্রচলন থাকলেও বর্তমানে তার পরিবর্তে কুমড়ো, আখ ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে বলির রীতি পালন করা হয়। সন্ধিপুজোর বিশাল আয়োজনও ছিল একসময় এই বাড়ির বিশেষ আকর্ষণ। এমনকি বিশেষ জাতের কলা না পাওয়া যাওয়ার সময় এক বৃদ্ধার হঠাৎ এসে সেই কলা বিক্রি করে যাওয়ার ঘটনাও পরিবারের কাছে দেবীর অলৌকিক কৃপা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

এই বাড়ির ইতিহাস শুধু স্থাপত্য আর পুজোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিজেদের কাজের মাধ্যমে রেখে গিয়েছেন আলাদা পরিচয়। মনীন্দ্রনাথ সরকার স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভয়পদ সরকার স্থানীয় নাট্যচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পিয়াসাড়া ভারতী ক্লাব। তাঁদের নাটকের অভিনয় একসময় কলকাতার পেশাদার নাট্যমঞ্চের প্রতিনিধিদেরও আকৃষ্ট করেছিল বলে জানা যায়।

পিয়াসাড়া গ্রামের সংস্কৃতিও সমান সমৃদ্ধ। গ্রামদেবতা ধর্মরাজ ঠাকুরের গাজন, শিবের আরাধনা এবং নানা লোকাচার আজও এই অঞ্চলের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই গ্রামেরই সন্তান ছিলেন কবিয়াল বলাই বৈষ্ণব, যাঁর কবিগানের খ্যাতি দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গৌরবময় অতীতের অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার বাড়ির কিছু অংশ ভগ্নপ্রায়, কোথাও আবার ধ্বংসের চিহ্ন স্পষ্ট। যে নাটমন্দিরে একসময় সংস্কৃতির আসর বসত, যে মন্দিরে উৎসবের আলো জ্বলত, সেই জায়গাগুলিই আজ সংরক্ষণের অপেক্ষায়।

পিয়াসাড়া সরকার বাড়ি তাই শুধু একটি পুরোনো জমিদারবাড়ি নয়। এটি বাংলার বনেদি সংস্কৃতি, দুর্গাপুজো, লোকশিল্প এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এই ঐতিহ্যকে যত্ন করে রক্ষা করা গেলে, আগামী প্রজন্মও জানতে পারবে গ্রামের মাটিতে লুকিয়ে থাকা এই গৌরবময় কাহিনি।

ইতিহাসের ইট-পাথর একদিন ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।

Read More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *