Global Odyssey of the Warrior Goddess

সিংহবাহিনী মাতৃশক্তির এক মহাজাগতিক যাত্রা

durga_global_odyssey
durga global odyssey

ভূমিকা: ব্যাংককের মিউজিয়াম থেকে শুরু হওয়া একটি বিস্ময়
২০১৪ সালে এক গবেষক থাইল্যান্ডের ব্যাংকক মিউজিয়ামে গিয়ে নবম শতাব্দীর একটি মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার মূর্তি দেখে থমকে যান । মূর্তিটির নির্মাণশৈলী এতটাই নিখুঁত ছিল যে মনে হচ্ছিল সেটি যেন সুদূর বাংলার কুমারটুলি থেকে তৈরি করে নিয়ে আসা হয়েছে । অথচ সেই প্রাচীন শিলা মূর্তিটি সংরক্ষিত ছিল থাইল্যান্ডে । এই একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এক মহা ভাবনার জন্ম দেয়: মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত কীভাবে বিস্তার লাভ করেছিল দেবী দুর্গার এই পরিচিত বিশ্বজনীন রূপটি?

ঋগ্বেদের অগ্নিবর্ণা দেবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সভ্যতায় সিংহবাহিনী নারী যোদ্ধার কল্পনা প্রাচীন মানব ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় ।

প্রাচীন বিশ্বের সিংহবাহিনী মাতৃদেবী ও ভাষাগত যোগসূত্র
জগৎজুড়ে মাতৃশক্তির আরাধনা মানব সভ্যতার একেবারে সূচনা থেকেই বর্তমান ।

গ্রীক ও মেসোপটেমীয় সমান্তরাল: গ্রীকদের ধরিত্রী দেবী ‘গায়া’, এশিয়া মাইনরের ‘সিবিলি’ (দেবতাদের মহীয়সী মাতা) এবং মেসোপটেমিয়ার প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ‘ইশতার’—সবাই ছিলেন একাধারে ধ্বংস ও সৃজনশীলতার প্রতীক । স্বামী বিবেকানন্দ লক্ষ্য করেছিলেন যে, যেখানেই মাতৃদেবীর শক্তি রূপায়িত হয়েছে, সেখানেই সিংহের উপস্থিতি দেখা যায়
আর্মেনিয়ার আনাহিতা ও নবসার্ধ উৎসব: প্রাচীন আর্মেনিয়ায় ‘আনাহিতা’ নামে উর্বরতা ও জ্ঞানের দেবী পূজিত হতেন, যাঁকে বলা হতো “গোল্ডেন মাদার” । তাঁর উদ্দেশ্যে ‘নবসার্ধ’ নামক এক মাসব্যাপী উৎসব পালিত হতো, যা আমাদের ‘শারদীয়া’ বা ‘নবরাত্রি’ শব্দের সাথে ভাষাতাত্ত্বিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত গভীর মেলবন্ধন নির্দেশ করে ।
কুষাণ মুদ্রা ও মধ্য এশিয়ার দেবী নানা (Nana): কুষাণ সাম্রাজ্যের প্রাচীন মুদ্রায় এবং আফগানিস্তান ও কাজাখস্তানের পাঞ্জিকেন্টের দেয়ালচিত্রে সিংহবাহিনী দেবী ‘নানা’-র উপস্থিতি মিলেছে ।
বালুচিস্তানের হিংলাজ মাতা: মধ্য এশিয়ার এই ‘নানা’ ধারণারই প্রতিফলন দেখা যায় আজকের পাকিস্তানের বালুচিস্তানের হিংলাজ মাতা শক্তিপীঠে, যা স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে ‘নানী মা’ বা ‘নানী মন্দির’ হিসেবে শ্রদ্ধা পেয়ে আসছে ।
সমুদ্র বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অবাধ প্রবাহ
বাণিজ্যিক রেশম পথ ও সামুদ্রিক পথগুলো কেবল মশলা বা রেশম পরিবহনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল জ্ঞান ও বিশ্বাসের আদান-প্রদানের মাধ্যম । ভারতীয় শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ ও বনিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (যেমন কম্বোডিয়া ও জাভা) রাজদরবারে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তাঁদের পান্ডিত্য ও প্রশাসনিক জ্ঞানের জন্য । কোনো প্রকার ধর্মপ্রচার বা চাপ সৃষ্টি ছাড়াই সংস্কৃত ভাষা তৎকালীন শিক্ষায় ও সংস্কৃতিতে বিশ্বজনীন সংযোগ তৈরি করেছিল ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দূর প্রাচ্যে দুর্গার বিভিন্ন রূপায়ণ
১. ইন্দোনেশিয়া: জাকার্তা জাদুঘর ও রোর জংরাং-এর লোককথা
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা জাতীয় জাদুঘরে অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর একাধিক অষ্টভূজা ও দশভূজা দুর্গার মূর্তি রয়েছে, যেখানে তিনি মহিষাসুরের চুল ধরে বধ করছেন । জাভার প্রম্বানান মন্দির প্রাঙ্গণে রাজকন্যা ‘রোর জংরাং’-এর গল্প প্রচলিত আছে । অসুর রাজার শর্ত পূরণ এড়াতে রাজকন্যা কৃত্রিম ভোর সৃষ্টি করলে অসুর রেগে গিয়ে তাঁকে পাথরের মূর্তিতে পরিণত করে । প্রম্বানান মন্দিরের সেই নবম শিলা মূর্তিটিই মূলত দেবী দুর্গার রূপ।

২. ভিয়েতনাম: চম্পা সাম্রাজ্য ও বালামোন চাম সম্প্রদায়
ভিয়েতনামের চম্পা সাম্রাজ্যের মাই সন হিন্দু মন্দিরগুলো যুদ্ধ ও বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সেখানকার ‘বালামোন চাম’ (ব্রাহ্মণ শব্দের অপভ্রংশ) জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে তাঁদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে । তাঁরা নবরাত্রিতে দুর্গাপূজা করেন এবং মহালয়ার মতো তর্পণ বা পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে থাকেন ।

৩. থাইল্যান্ড: ব্যাংককের সিলোম ও ফুকেটের নিরামিষ উৎসব
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে দশমীর দিনে ব্যস্ততম সিলোম এলাকার রাস্তায় ‘মারিয়ামমান মন্দির’ থেকে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ শোভাযাত্রা বের হয়, যেখানে হাজার হাজার থাই বৌদ্ধ নাগরিক দুর্গা ও কালীর মূর্তি নিয়ে উৎসবে অংশ নেন। ফুকেটে ‘নাইন এম্পেরর গডস ফেস্টিভাল’ উদযাপিত হয় এবং থাই রাজপরিবার ব্যাংককের প্রাচীন ‘দেবস্থান’ ব্রাহ্মণ্য মন্দিরে পূজা প্রদান করেন ।

৪. জাপান, ফিলিপাইন ও মায়ানমার
জাপান: বৌদ্ধ দেবমন্ডলীর ১৮-হাত বিশিষ্ট ‘জূনী কানন’ (Cundī Kannon) দেবী নবজাতকদের রক্ষা করেন, যা আমাদের ‘মা ষষ্ঠী’ বা দুর্গার রূপকল্পের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ।
ফিলিপাইন: নবম শতাব্দীর সোনার ‘আগুسان তারা’ (Agusan Tara) মূর্তিতে তান্ত্রিক হিন্দু-বৌদ্ধ ভাবধারার সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান ।
মায়ানমার: স্থানীয় ‘নাথ’ বা আত্মা উপাসনায় হিন্দু দেবদেবীর মিশ্রণ দেখা যায় ।
সাংস্কৃতিক কালক্রম / সময়রেখা (Cultural Evolution Timeline)
সময়কাল / যুগ অঞ্চল / সভ্যতা সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
আদিম ইতিহাস ও প্রাচীন কাল মেসোপটেমিয়া, গ্রীস, আর্মেনিয়াcইশতার, গায়া, সিবিলি ও আর্মেনিয়ার দেবী আনাহিতার ‘নবসার্ধ’ উৎসবের প্রচলন।
কুষাণ যুগ (১ম – ৩য় শতাব্দী),মধ্য এশিয়া, পাঞ্জিকেন্ট, আফগানিস্তান কুষাণ মুদ্রায় সিংহবাহিনী দেবী ‘নানা’-র চিত্রায়ন এবং দেয়ালচিত্রের প্রমাণ।
৮ম – ৯ম শতাব্দী থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ব্যাংকক মিউজিয়ামে কুমারটুলি শৈলীর মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি এবং ফিলিপাইনের স্বর্ণালী আগুسان তারা ।
৮ম – ১৫শ শতাব্দী ইন্দোনেশিয়া (জাভা, বালি) জাকার্তা জাদুঘরের শিলা মূর্তি এবং প্রম্বানানের ‘রোর জংরাং’ (দেবী দুর্গা) লোককথা ও মন্দির নির্মাণ ।
আধুনিক যুগ (বর্তমান) থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ব্যাংককের সিলোমে ৫ কিমি দীর্ঘ শোভাযাত্রা, ভিয়েতনামের চামদের নবরাত্রি পূজা এবং হিংলাজ দেবীকে ‘নানী মা’ রূপায়ণ ।
উপসংহার: শক্তির বিবর্তন ও সংস্কৃতির প্রবহমানতা
পৌরাণিক আখ্যানের গভীরে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রাচীনকালে মহিষাসুর বধের কৃতিত্ব স্কন্দ বা কার্তিকেয়ের সাথে যুক্ত থাকলেও, পরবর্তীতে পুরাণে শক্তির কেন্দ্রবিন্দু পুরুষ দেবতা থেকে নারী দেবীতে রূপান্তরিত হয় । এই স্থানান্তর তৎকালীন সমাজের সামাজিক মূল্যবোধ ও শক্তির বিবর্তনের প্রতীক । দেবী দুর্গা কেবল ভারতের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নন; নদী যেমন বিভিন্ন প্রান্ত ছুঁয়ে তার নিজস্ব গতিপথ তৈরি করে, দেবী দুর্গার আরাধনাও তেমনি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির রঙে রঞ্জিত হয়ে এক সর্বজনীন মাতৃশক্তিতে পরিণত হয়েছে ।

Read More